ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের মূল কারণ জ্বালানি তেল বলে মনে করা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযান–পরবর্তী কথায় ভেনেজুয়েলায় জ্বালানি তেলের ভান্ডারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দিয়েছেন। লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলাতেই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রমাণিত জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে, যার পরিমাণ ৩০৩ বিলিয়ন (৩০ হাজার ৩০০ কোটি) ব্যারেলের বেশি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ। ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বেশি তেলের মজুত রয়েছে অরিনাকো বেল্ট অঞ্চলে, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভারী তেল সংরক্ষণ এলাকা। এই ঘন ও গাঢ় অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে ডিজেল, কেরোসিন ও জেট ফুয়েল তৈরি করা হয়। কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে। এতে কারাকাসের তেল রপ্তানি, অর্থপ্রবাহ ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগে গুরুতর প্রভাব পড়েছে এবং দেশটির অর্থনীতিতে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। গত শনিবার সামরিক অভিযান চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার তিন দিন পর মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তাঁর প্রশাসন কারাকাসের সঙ্গে ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলার সমমূল্যের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি চুক্তিতে পৌঁছেছে।
ভেনেজুয়েলার পর সৌদি আরব, যেখানে ২৬৭ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি প্রমাণিত জ্বালানি তেল মজুত। সৌদি আরবের অর্থনীতি মূলত তেল রপ্তানিনির্ভর। ওপেকের নেতৃত্বে থাকা এই দেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ তেল উত্তোলনকারী। ২০২৭ সালের মধ্যে দৈনিক তেল উৎপাদন ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করতে চায় এবং অনেক বিশ্লেষক বলছেন, এ লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। সৌদি আরবের তেল হালকা, বিশ্ববাজারে চাহিদা বেশি এবং সহজে পরিশোধনযোগ্য, যাতে পেট্রল, ডিজেল ও কেরোসিন পাওয়া যায়।
ইরানে ২০৮ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি প্রমাণিত জ্বালানি তেল মজুত। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতিতে মারাত্মক চাপ। ইরানের দৈনিক তেল উৎপাদন গড়ে ২৩ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল এবং দৈনিক ৭ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেলের কিছু বেশি অপরিশোধিত তেল রপ্তানি। ইরানের তেল মূলত মাঝারি বা ভারী ঘনত্বের, যাতে ডিজেল, কেরোসিন ও হেভি ফুয়েল অয়েল পাওয়া যায়।
কানাডায় ১৬৩ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি প্রমাণিত তেল মজুত, যার বড় অংশ আলবার্টা প্রদেশ থেকে। কানাডা বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম তেল উত্তোলনকারী, দৈনিক গড়ে ৫৮ থেকে ৬০ লাখ ব্যারেলের বেশি উত্তোলন করে, যা বিশ্বের মোট উত্তোলনের প্রায় ৬ শতাংশ। কানাডার তেলের সিংহভাগ বিটুমিন বা অয়েল স্যান্ড, যা বালু ও পানিমিশ্রিত ভারী এবং পরিশোধন জটিল।
ইরাকে প্রায় ১৪৫ বিলিয়ন ব্যারেল প্রমাণিত তেল মজুত। তেল উত্তোলনে সৌদির পরেই ইরাক, ওপেক সদস্য, দৈনিক গড়ে ৪৪ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল উত্তোলন করে, যা বিশ্বের ৪ শতাংশ। উত্তোলিত তেলের ৮০ শতাংশ রপ্তানি। ইরাকের তেল হালকা থেকে মাঝারি ঘনত্বের, সালফার কম, পরিশোধন সহজ এবং পরিবেশের জন্য কম ক্ষতিকর।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১১৩ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি প্রমাণিত তেল মজুত, মূলত আবুধাবি থেকে (মোটের ৯৬ শতাংশ)। দৈনিক গড়ে ৪১ লাখ ব্যারেলের বেশি উত্তোলন এবং ৬৬ শতাংশ রপ্তানি।
কুয়েতে ১০১ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি প্রমাণিত তেল মজুত। অর্থনীতি পুরোপুরি তেলনির্ভর। দৈনিক গড়ে ২৯ লাখ ব্যারেলের বেশি উত্তোলন এবং ৭১ শতাংশ রপ্তানি। ওপেকের প্রভাবশালী সদস্য, তেল ও গ্যাস উত্তোলন সক্ষমতা বাড়াতে এবং পরিশোধন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে।
রাশিয়ায় ৮০ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি প্রমাণিত তেল মজুত। তেল উত্তোলনে তৃতীয়, দৈনিক গড়ে প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল (বিশ্বের ১১ শতাংশ)। ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, কিন্তু চীন ও ভারত সস্তায় কিনছে। যুক্তরাষ্ট্র শাস্তিস্বরূপ শুল্ক আরোপ করে ভারতকে রাশিয়ার তেল কেনা থামাতে চাইছে।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রমাণিত তেল মজুত প্রায় সাড়ে ৭৪ বিলিয়ন ব্যারেল, যদিও তথ্যগত ভিন্নতা রয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ তেল উত্তোলনকারী, ইআরএর হিসাবে দৈনিক গড়ে ২ কোটি ১২ লাখ ব্যারেল (বিশ্বের ২২ শতাংশ)। জ্বালানি তেলের ভোক্তাতেও প্রথম, দৈনিক প্রায় ২ কোটি ব্যারেল চাহিদা (বিশ্বের ২০ শতাংশ)।
লিবিয়ায় প্রায় সাড়ে ৪৮ বিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুত। দৈনিক গড়ে ১২ লাখ ব্যারেল উত্তোলন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে বিশ্ববাজারে অবদান সামান্য। ইউরোপ বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে ঝুঁকছে। শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে ৫টি মধ্যপ্রাচ্যের। তথ্যসূত্র: অয়েল অ্যান্ড গ্যাস জার্নাল, ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ)।